তরুণদের মাদকাসক্তি আর কিছু কথা

[ লিখেছেন: তাইসির হক ]


আপনি হয়তো এই লিখাটি পড়তে খুব বেশি ইচ্ছুক হবেন না।কারণ, মাদক নিয়ে হাজারো লিখা ইতিমধ্যে আমাদের দেশে প্রকাশিত হয়েছে এবং আপনার মনে হতে পারে এইটি হয়তোবা তেমনি একটি লিখা।

তবে, দাঁড়ান …

একটু ভেবে দেখুনতো।আপনার পরিবারের কোনো সদস্যের জীবন নষ্ট করতে পারে এই মাদক। আপনার সন্তান, আপনারভাই, আপনার বোন বা পরিবারের অন্য কোনো সদস্যকে এই মাদকের আগ্রাসন থেকে মুক্ত রাখতে তাই আপনাকে হতে হবে সচেতন।

সচেতন হতে হবে এখনই।

আপনার পরিবারের প্রিয় সদস্যটি মাদকাসক্তির কারণে নিজের ব্যক্তিগত অনেক ক্ষতি করতে পারে। তার মস্তিষ্কের হতে পারে অপূরণীয় ক্ষতি।

সাধারণ একজন মানুষের যে নৈতিকতা বোধ থাকে, তা মাদকাসক্তির কারণে কমতে থাকে। এই নৈতিকতা অবক্ষয়ের কারণ হলো: মাদকসেবনের মাধ্যমে একজন মাদকসেবনকারী ভাল-খারাপের পার্থক্য বুঝতে পারে না। কোন কাজটি ভাল এবং কোনটি খারাপ এই পার্থক্য নির্ণয় করা একজন মাদক সেবনকারীর মস্তিষ্কের জন্য কষ্টকর ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে পরে।

ভাল-খারাপের পার্থক্য বুঝতে না পারার কারণে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি অপরাধ সংগঠনের ক্ষেত্রে কোনো দ্বিধাবোধ করে না। অতএব, আপনার পরিবারের আদুরে ও প্রিয় সদস্যটি মাদক সেবন করতে শুরু করলে, তার হাতে অপরাধ সংগঠিত হবার সম্ভবনা থাকে। এমনকি সে খুনের মতো নিন্দনীয় অপরাধও সংগঠন করতে পারে।

এছাড়াও, প্রতিনিয়ত মাদক সেবন করার কারণে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির শারীরিক সক্ষমতা দিনে দিনে কমতে থাকে। এমনকি বন্ধ্যাত্ব বা যৌন-অক্ষমতাও হতে পারে।

মাদকের প্রতি তরুণদের ঝুকে পরার কারণসমূহ

আপনার কাছের মানুষগুলো কি কি কারণে মাদকের প্রতি আসক্ত হতে পারে, আপনার আবশ্যই সেই কারণগুলো জেনে রাখা উচিত।

একজন মানুষের মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে উঠার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। এগুলোর মধ্যে যেসব কারণগুলো বর্তমানে আমাদের সমাজকে সবচাইতে বেশি প্রভাবিত করছে, সেগুলো এখানে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করা হলো।

পরিবার থেকে নৈতিকতার শিক্ষার অভাব:

আমাদের দেশের তরুণদের মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে উঠার পেছনের অন্যতম প্রধান কারণ হলো: একজন মানুষ ‘শিশু থেকে কিশোর’ এবং ‘কিশোর থেকে পরিপূর্ণ যুবক’ হয়ে উঠার যে সময়কাল, বর্তমান যুগে সেই স্পর্শকাতর সময়কালে তারা নিজ পরিবারের বড়দের (বিশেষ করে পিতা-মাতার) থেকে নৈতিক শিক্ষা পাচ্ছে না অথবা যেটুকু পাচ্ছে তা যথেষ্ট নয়। এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ।

প্রথমত, যেহেতু পিতা-মাতা তাদের কর্মব্যস্ত জীবন থেকে সন্তানদের জন্য সময় বের করতে পারছেন না, সেহেতু তারা তাদের সন্তানদের মানসিকতাকে সুস্থভাবে গড়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। তারা পারছেন না স্থিরভাবে একসাথে বসে সন্তানদের চিন্তা-চেতনায় নৈতিকতার বোধ সৃষ্টি করতে। আর এই নৈতিকতার অভাবে সন্তানদের মধ্যে ভাল-খারাপের পার্থক্য অস্পষ্ট রয়ে যাচ্ছে। সন্তানরা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছেনা যে, কোন বিষয়গুলো নৈতিক, আর কোনগুলো অনৈতিক। কোনটি সঠিক, কোনটি বেঠিক।

দ্বিতীয়ত, অনেক পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের উজ্জ্বল ‘আর্থিক’ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সন্তানদের ভবিষ্যতে কিভাবে ‘অর্থনৈতিকভাবে’ সফল হতে হবে, কেবল মাত্র সেই শিক্ষা দেয়াতেই মনোনিবেশ করছেন। এর ফলে, সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা দেয়ার সময় ও সুযোগ হচ্ছে না, অথবা পিতামাতা যতটুকু সময় ও সুযোগ সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা দেয়ার পেছনে দিচ্ছেন তা যথেষ্ট নয়।

অতএব, উজ্জ্বল ‘অর্থনৈতিক’ ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষার কাছে ‘নৈতিকতা’ হেরে যাচ্ছে।

তৃতীয়ত, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অনেক পিতা-মাতা পুরোপুরি অনৈতিক না হলেও, তাদের নিজেদেরই কাজেকর্মে নৈতিকতার অভাব আছে। অথবা, তারা নিজেরাই যথেষ্ট নৈতিকতার শিক্ষা পান নি, এবং পরবর্তীতে নিজেরা স্বউদ্যোগে নৈতিকতা সম্পর্কে তাদের স্বল্প-ধারণাকে সম্প্রসারিত করার চেষ্টাও করেন নি। যেহেতু পিতা-মাতারই ধারণা এই ব্যাপারে অস্বচ্ছ, সন্তানদেরও তাই এই ব্যাপারে তারা স্বচ্ছ ধারণা দিতে পারছেন না।

মাদক যখন ফ্যাশন:

‘শিশু থেকে কিশোর’ এবং ‘কিশোর থেকে পরিপূর্ণ যুবক’ হয়ে উঠার সময়কালটির স্পর্শকাতরতা সম্পর্কে ইতিমধ্যেই এই প্রবন্ধটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এই উঠতি বয়সে ছেলেমেয়েরা বেশ এডভেঞ্ছারাস (adventurous) হয়ে থাকে। যেকোনো নতুনতা ও ভিন্নতাকে ট্রেন্ড বা ফ্যাশন ভেবে বসে। পরবর্তীতে তারা সেই ভিন্ন ও নতুনতাকে আপন করে নিতে দ্বিধাবোধ করে না। একইভাবে অনেকে মাদকাসক্ত বন্ধুদের বা সিনিয়রদের মাদক সেবন করতে দেখে এই বিষয়টিকে ফ্যাশন বা ট্রেন্ড হিসেবে ভেবে বসে; এবং তাদের এডভেঞ্ছারাস (adventurous) মানসিকতা তাদের এই মাদকের দিকেই টেনে নিয়ে যায়। 

শিক্ষা ও কর্মসংস্থান:

অনেক সময় দেখা যায় যে, কেউ পুরোপুরি বেকারত্বের কারণে আর কেউবা আন্ডার-এমপ্লয়মেন্টের (যোগ্যতার তুলনায় নিম্নমানের কর্মসংস্থান/চাকুরী/ইনকাম-এর) কারণে অতি হতাশ হয়ে পরছে এবং এর ফলশ্রুতিতে তাদের মধ্যে মাদকের প্রতি আসক্তি তৈরি হচ্ছে।

তাছাড়া, অনেক সন্তানরা যেই বিষয়ে পড়াশোনা করতে চায় এবং যেই বিষয়ে তাদের আগ্রহ বা ইন্টারেস্ট আছে, সেই বিষয়ে পরিবার থেকে তাদের সমর্থন বা সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে না। নিজেদের অনিচ্ছায় সন্তানদের সেই বিষয়ে পড়াশোনা করতে হচ্ছে, যেই বিষয়ে পরিবার তাদেরকে পেশাজীবী হিসেবে কর্মক্ষেত্রে দেখতে চায়। তাইতো ক্রিকেটার হওয়ার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পড়াশোনা করতে হচ্ছে মেডিকেল-এ; কারণ পরিবারের ইচ্ছা সন্তান তাদের ডাক্তার হবে…!

এর মধ্যে কোনোভাবে পরিবারের ইচ্ছা অনুযায়ী পড়াশোনা শেষ করে পেশায় জড়িত হয়ে গেলে তো ভালোই; কিন্তু ইচ্ছার বিরুদ্ধের শুরু করা পড়াশোনা শেষ করতে যদি ব্যর্থ হয়, অথবা পড়াশোনা শেষে যদি কর্মসংস্থান বা employment না হয়, অথবা কর্মসংস্থান হওয়ার পরেও ঐ পেশায় বা profession-এ অনিহা ও অনিচ্ছা থেকে যায়, সেই ক্ষেত্রে ঘিরে ধরে হতাশা বা frustration। আর এই হতাশা মাদকের প্রতি আসক্তি সৃষ্টি হওয়ার প্রধানতম কারণ।

মাদকের আধিপত্য ও মাদকাসক্তি রোধে করণীয়

যেকোনো সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে প্রধানতম হাতিয়ার হলো সামাজিক সচেতনতা বা social awareness। মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। পরিবার থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত মাদকের কুফলসমূহের ব্যাপারে প্রতিনিয়ত আলোচনা করতে হবে। রাতে খাবার টেবিলে ও সকালে শ্রেণীকক্ষে প্রতিনিয়ত মাদকাসক্তিসহ সকল সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে হবে মূলত পরিবারের সদস্যদের ও শিক্ষকদের।

সন্তানদের নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়ার আগে পিতা-মাতাকে নিজেদের নৈতিকতার জায়গাকে ঠিক করে নিতে হবে। নিজেরা নৈতিকতা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখলে এবং নৈতিকভাবে চললে সন্তানরাও পিতা-মাতাকে নৈতিকতার আদর্শ হিসেবে বেছে নিতে পারবে। অন্যথায়, পিতা-মাতার অনৈতিক কর্মকাণ্ড সন্তানদের জন্যে নেতিবাচক উদাহরণ হয়ে থাকবে এবং তারা নৈতিকতার ভুল শিক্ষা গ্রহণ করবে। আর এটির পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর।

তাছাড়া, সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদেরও মাদকাসক্তের নেতিবাচক দিকগুলোর ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে সহযোগিতা করতে হবে। স্পোর্টস ব্যক্তিত্ব, শিল্পী, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, শিক্ষকসহ সমাজের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের স্বপ্রণোদিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

তাছাড়া, মাদকের আধিপত্য ও মাদকাসক্তি রোধে যেকোনো দেশের সরকারকে চালকের ভূমিকায় থাকতে হয়। যেকোনো দেশের সরকারের দায়িত্ব দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার জন্যে যথাযথ পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টি করা এবং তা বজায় রাখা। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে মাদকের ছোবলে আচ্ছাদিত হয়ে না পরে, সেই উদ্দেশ্যে মাদকের ব্যবসা প্রথমে নিয়ন্ত্রণ ও পরবর্তীতে নির্মূল করার জন্যে উদ্যোগী হওয়া আবশ্যক। এর জন্যে একটি দেশে একটি শক্তিশালী মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থাকা আবশ্যক।


 

Hits: 472

তাইসির হক

তাইসির হক যুক্তরাজ্যের নর্দাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। আইন পেশার সাথে জড়িত থাকার পাশাপাশি তিনি সামাজিক বিভিন্ন বিষয়াদি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.