আন্তর্জাতিক মতামত

শ্রীলংকায় চীনা প্রভাব ও সম্পৃক্ততা আগামীতে আরও বাড়বে

Summary

প্রাথমিক পর্যায়ে চীনা প্রভাব কমানোর চেষ্টা করলেও সিরিসেনা সম্ভবত পরে বুঝতে পারেন যে, চীন আরও আগেই দেশে একটা গভীর প্রভাব তৈরি করেছে এবং এই বাস্তবতাটা অস্বীকার করাটা বোকামি হবে বলে তিনি সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন। সে কারণে তার সামনে আর কোন উপায় ছিল না এবং শেষ পর্যন্ত চীনা প্রকল্পগুলো আবার তাকে শুরু করতে হয়।


বাহাউদ্দিন ফয়যী | এশিয়া টাইমস


গত নভেম্বরে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গোতাবায়া রাজাপাকসার জয়ের পর অনেকেই অনুমান করছেন যে, দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে চীন আবার ফিরে আসবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো চীন আসলে কখনই শ্রীলংকা ছেড়ে যায়নি।

যদিও ২০১৫ সালের নির্বাচনে মাহিন্দা রাজাপাকসা মৈত্রিপালা সিরিসেনার কাছে হেরে যাওয়ার পর সিরিসেনা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, শ্রীলংকার চীন নীতিতে তিনি ভারসাম্য আনবেন, কিন্তু প্রথম দিকে কিছুটা চেষ্টা করলেও তিনি আসলে তার প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেননি। সে কারণে এমনকি সিরিসেনার আমলেও শ্রীলংকায় চীনা প্রভাব ও সংশ্লিষ্টতা বৃদ্ধি অব্যাহত থেকেছে।

গোতাবায়ার জয়ের মধ্য দিয়ে তাই চীনের ফিরে আসার কোন প্রসঙ্গ আসছে না। বরং মাহিন্দা রাজাপাকসা ও মৈত্রিপালা সিরিসেনার আমলে চীন যে প্রভাব উপভোগ করেছে, সেটারই ধারা অব্যাহত থাকবে গোতাবায়ার আমলে।

মাহিন্দার অধীনে চীনা প্রভাব

২০০৫ সালে মাহিন্দা রাজাপাকসা প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে চীনের সংশ্লিষ্টতা ক্রমেই বেড়েছে, এবং ২০১৫ সালে তিনি পরাজিত হওয়ার পরও চীনের এই প্রভাব বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল।

শ্রীলংকায় চীনের বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অধীনে দেয়া ঋণের পরিমাণ হলো ৮ বিলিয়ন ডলার। একটি চীনা কোম্পানি শ্রীলংকায় বিশাল সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। আরেকটি চীনা কোম্পানি কলম্বোর কাছে ১.৪ বিলিয়ন ডলারের বন্দর শহর তৈরি করছে। চীনা কোম্পানিগুলো বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণেরও পরিকল্পনা করছে।

বিশেষ করে মাহিন্দা রাজাপাকসার নেতৃত্বে – যিনি ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন – তার আমলে চীনের সাথে শ্রীলংকার ঘনিষ্ঠ ও উষ্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। তার আমলে, দেশের অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা খাতে চীনকে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ব্যাপক সুযোগ দেয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে চীনের যে প্রভাব শ্রীলংকায় তৈরি হয়েছে, সেটাকে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই।

চীনা প্রভাব কখনও যায়নি

তবে, ২০১৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাহিন্দা রাজাপাকসা পরাজিত হওয়ার পর, সিরিসেনা সাময়িকভাবে চীনের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করেছিলেন। ভারত আর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছিলেন সিরিসেনা।

প্রাথমিক পর্যায়ে, সিরিসেনা দুর্নীতি আর অতিরিক্ত ব্যায়ের কথা বলে সকল চীনা বিনিয়োগ প্রকল্প স্থগিত করেন। এক বছর পরে, তিনি চীনা প্রকল্প আবার চালুর অনুমোদন দেন, তবে শর্তাদির ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তনের দাবি জানান।

প্রাথমিক পর্যায়ে চীনা প্রভাব কমানোর চেষ্টা করলেও সিরিসেনা সম্ভবত পরে বুঝতে পারেন যে, চীন আরও আগেই দেশে একটা গভীর প্রভাব তৈরি করেছে এবং এই বাস্তবতাটা অস্বীকার করাটা বোকামি হবে বলে তিনি সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন। সে কারণে তার সামনে আর কোন উপায় ছিল না এবং শেষ পর্যন্ত চীনা প্রকল্পগুলো আবার তাকে শুরু করতে হয়।

সিরিসেনার অধীনেই শ্রীলংকাকে হামবানতোতা গভীর সমুদ্র বন্দরটি চীনের কাছে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দিতে হয়, কারণ চীনা ঋণ শোধ করার সামর্থ দ্বীপ রাষ্ট্রটির ছিল না।

গোতাবায়ার অধীনে চীনা প্রভাব বাড়বে

এখন যেহেতু মাহিন্দা রাজাপাকসার ছোট ভাই গোতাবায়া ক্ষমতায় এসেছেন, এ অবস্থায় এমন সম্ভাবনা রয়েছে যে, তিনি শ্রীলংকাকে চীনের দিকে আরও এগিয়ে নিবেন।

শ্রীলংকা যখন চীনের পূর্ণ সহায়তা নিয়ে তামিল গেরিলাদের বিরুদ্ধে ২৬ বছরের যুদ্ধের ইতি টানে, গোতাবায়া তখন প্রতিরক্ষা সচিব ছিলেন। আন্তর্জাতিক মহল যখন যুদ্ধের শেষ দিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যু উত্থাপন করেছে, তখন চীনই রাজাপাকসা ভাইদেরকে এই অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করেছে।

এর পরও ২০১৫ সালে মাহিন্দা রাজাপাকসা হেরে যাওয়ার পরও শ্রীলংকায় চীনের প্রভাব কখনও শেষ হয়নি। সিরিসেনা আমলের শুরুর দিকে কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও পরে ঠিকই চীনের প্রভাব ফিরে এসেছে। এখন গোতাবায়া রাজাপাকসা যেহেতু প্রেসিডেন্ট এবং মাহিন্দা নিজেই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন, এ অবস্থায় চীনের প্রভাব আর সম্পৃক্ততার মাত্রা আগামীতে আরও বাড়বে বলে ধারণা করা যায়।


বাহাউদ্দিন ফয়যী একজন আন্তর্জাতিক বিষয়ক কলামিস্ট । বিশ্বের বিভিন্ন থিংক-ট্যাংক ও গবেষণা-সংস্থার প্রকাশনায় এবং আন্তর্জাতিক স্বনামধন্য পত্রিকায় প্রায়শ তার বিশ্লেষণ ও মতামত প্রকাশিত হয়ে থাকে।  বাহাউদ্দিন ফয়যী তার কলামগুলোতে পরিবেশ ও জলবায়ু-পরিবর্তন, সামাজিক বিষয়াদি, শরণার্থী-সংকট ও ভূ-রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়াদি সম্পর্কে লিখে থাকেন।


 

Share This