আন্তর্জাতিক আর্টিকেল

গরু পাচার ঠেকাতে ভারতের কঠোর পদক্ষেপে বাংলাদেশের জিডিপি বেড়েছে

Summary

“বাংলাদেশে প্রতি বছর দুই মিলিয়ন মানুষ শিক্ষা শেষ করছে। তাদের অনেকে গরুর খামার এবং মাংস উৎপাদনের ব্যবসার সাথে যুক্ত হচ্ছে, যেই ব্যবসাটা আগে গ্রামীন দরিদ্র জনগোষ্ঠি নিয়ন্ত্রণ করতো। অব্যাহত প্রবৃদ্ধি আর ভারতের নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত ছাড়া এটা সম্ভব হতো না,” বলেছেন বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশানের সাধারণ সম্পাদক শাহ এমরান।


শুভজিৎ বাগচি | টিআরটি ওয়ার্ল্ড


ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে গরু পাচার ঠেকাতে ভারত সরকার খড়্গহস্ত হওয়ার পর বাংলাদেশে এই শিল্পের ব্যাপক বিকাশ হয়েছে।

খামার তৈরি থেকে শুরু করে গরুর বংশবিস্তার, মোটাতাজাকরণ এবং দুধ উৎপাদন – সবকিছুরই বিকাশ হয়েছে বাংলাদেশে। অন্যদিকে ভারতীয় অংশে মূলত কর্মহীন জনগোষ্ঠি এই খাতটির দেখাশুনা করছে, এবং এখন তারা দারিদ্রে নিপতিত হয়েছে।

বাংলাদেশে গত ২০ বছর ধরে জিডিপি ক্রমাগত বাড়ছে। ২০১৯ সালে আট শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে তাদের। আর্থিক প্রবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। তাদের আমিষ গ্রহণের হার বেড়েছে, এবং অধিকাংশ মানুষ এখন মাংস ও দুধজাত খাবার কেনার সামর্থ রাখে।

ইউনাইটেড নেশান্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশানের (ইউএনআইডিও) ২০১৯ সালের রিপোর্টে বলা হয়েছে, “আধা ডজনের বেশি দুধ প্রক্রিয়াজাত কোম্পানি এখন দিনে প্রায় ১০ লাখ লিটার দুধ তৈরি করছে, যেটা এক দশক আগের সক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি”।

এতে আরও বলা হয়েছে, “গরুর মাংসের ব্যাপারে ২০১৮ সালে সরকার প্রথমবারের মতো স্বনির্ভরতার ঘোষণা দিয়েছে। ৭.২১ মিলিয়ন টন চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৭.২৬ মিলিয়ন টন”।

সীমান্তে গরুর চলাফেরা কমে গেছে

৩০ বছর বয়সী কৃষক মো. জাহাঙ্গির আলম বললেন, “সাধারণত শীতকালে যখন কুয়াশা থাকে, তখন স্থলপথে গরু নেয়া হয়। আর যখন কুয়াশা থাকে না, তখন নদীপথে নেয়া হয়”।

আলম বাস করেন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে নারায়নপুর চর পয়েন্টে। এই পয়েন্ট দিয়ে আসাম থেকে গরু আনতো সে।

ব্রহ্মপুত্র নদের উজানে নদীতে গরু নামিয়ে দেয়া হয়। এরপর নারায়নপুরের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে তাদের উদ্ধার করে, এবং কৃষকদের কাছে পৌঁছানো হয়, যারা সেগুলো ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে।

এই বাণিজ্যের আকাশ ছিল বিশাল এবং পশুগুলো ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় ও পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো থেকে আসতো এবং নারায়নপুরের মতো পয়েন্টগুলো দিয়ে সেটা বাংলাদেশে ঢুকতো। ভারতে একটি স্বাস্থ্যকর গরুর দাম ২০০ থেকে ৪০০ ডলারের মতো এবং বাংলাদেশে সেটাকে ১০০০ ডলারে বিক্রি করা হয়। ফলে এই ব্যবসাটি কার্যত বিপুল লাভজনক।

ইউএনআইডিও জানিয়েছে যে বাংলাদেশের পুরো ‘গবাদি পশুর সরবরাহের ২০ শতাংশই আসে’ অনানুষ্ঠানিক সীমান্ত বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে।

বাংলাদেশ মিট মার্চেন্টস’ অ্যাসোসিয়েশানের মতে এই শতাংশ হলো ৩৫।

আলম বলেন, “চরের প্রতিটি বাড়িতেই একটি বা দুটি গরু আছে। আগে ভারতীয় গরু থাকতো, এখন গরুগুলো বাংলাদেশি”।

মিট অ্যাসোসিয়েশানের সাধারণ সম্পাদক রবিউল আলম বলেন, ভারতীয় গরুর সংখা চার মিলিয়ন থেকে কমে পাঁচ লক্ষে নেমে এসেছে।

খামারের প্রসার হয়েছে

কিন্তু গরুর মাংসের ব্যবহার যদিও কিছুটা কমে গেছে, তারপরও পশু খামারের সংখ্যা বেড়েছে অনেক। ২০১১ সালে যেখানে খামারের সংখ্যা ছিল ৩৩,০০০, ২০১৭ সালে সেটা বেড়ে পাঁচ লক্ষ হয়েছে।

ফরিদপুরের মার্শ অ্যাগ্রো ফার্মের মির কাসেম আলি খামারিদের একজন। তিনি বলেন, “দুই বছর আগে আমার গরু ছিল ১০টি, এখন আছে ১৮টি”।

দুধ ব্যবসায়ী আলি মিষ্টির দোকানিদের কাছে প্রতিদিন প্রায় ১০০ লিটার দুধ বিক্রি করেন। নিজের ব্র্যাণ্ড পিউরিটি তৈরি করে উৎপাদন বাড়িয়েছেন তিনি। একইসাথে কাঁচা মাংসও বিক্রি করছেন তিনি।

বাংলাদেশে দুধের উৎপাদন বিপুল বেড়েছে। ২০১৬-১৭ সালে দুধ উৎপাদন হয়েছে বছরে ৭.৩ মিলিয়ন মেট্রিন টন। ২০১৮তে হয়েছে ১০ মিলিয়ন মেট্রিক টন। বাংলাদেশের ডিপার্টমেন্ট অব লাইভস্টক সার্ভিসেস এ তথ্য জানিয়েছে।

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশানের সাধারণ সম্পাদক শাহ এমরান বলেন, “ভারতের গরু রফতানির নিষেধাজ্ঞা এক হিসেবে বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হয়েছে। বাংলাদেশের নিজস্ব উৎপাদন এতে দ্রুত বেড়ে গেছে”।

গরু চাষীদের ব্যাপারে ধারণাটাও বদলে গেছে।

এমরান বলেন, “বাংলাদেশে প্রতি বছর দুই মিলিয়ন মানুষ শিক্ষা শেষ করছে। তাদের অনেকে গরুর খামার এবং মাংস উৎপাদনের ব্যবসার সাথে যুক্ত হচ্ছে, যেই ব্যবসাটা আগে গ্রামীন দরিদ্র জনগোষ্ঠি নিয়ন্ত্রণ করতো। অব্যাহত প্রবৃদ্ধি আর ভারতের নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত ছাড়া এটা সম্ভব হতো না”।

Share This