আন্তর্জাতিক মতামত

শি’র সফর: মিয়ানমারকে আরো কাছে টানল চীন

Summary

অনেক বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকই প্রেসিডেন্ট শির সফরটিকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। এর ফলে এই অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব খর্ব হতে পারে। এই দিকটি বিবেচনা করা হলে বলতেই হবে শির সফরটি ছিল খুবই সফল। উল্লেখ্য যে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে চীনের ওপর চড়াও হয়েছিল, তাতে করে মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করাটা চীনের জন্য বিশেষভাবে প্রয়োজনীয় ছিল।

Aung San Suu Kyi, Myanmar peace process

ল্যারি জাগান | এসএএম


চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের গত মাসে ঐতিহাসিক মিয়ানমার সফরের লক্ষ্য ছিল দেশটিকে আরো কাছে টানা এবং বেইজিংয়ের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বটি বিশ্বকে বোঝানো। তাছাড়া চীনের দক্ষিণ দিকের প্রতিবেশী- কম্বোডিয়া, লাওস ও বিশেষ করে মিয়ানমারের কাছ থেকে চীনা দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সমর্থন আদায়ও ছিল টার্গেট। দুই পক্ষই বিপুল আয়োজন করলেও সফরের ফলাফল হয়েছে খুবই সামান্য।

যুক্তরাষ্ট্রের স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো ও চীনা পররাষ্ট্র বিষয়ক নীতির বিশেষজ্ঞ ইউ সান সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বলেন, সফরটি ফলপ্রসূ হলেও যতটা প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা হয়নি। সফরটি হয় পড়েছে অনেকটাই প্রতীকি।

এই সফরটি কখনোই অর্থনৈতিক বা ফলাফলমুখী ছিল না। এক চীনা কর্মকর্তা এমনটাই জানালেন। তিনি বলেন, এটি ছিল রাজনৈতিক সফর। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে, বিশেষ করে আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের কাছে যাওয়ার এবং সাম্য, ন্যায়বিচার ও সম্প্রীতির ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা পেশ করাই ছিল এই সফরের লক্ষ্য। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বেইজিং ও মিয়ানমারের মধ্যে বিশেষ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা বা ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ছিল বিশেষ লক্ষ্য।

বিষয়টি যেহেতু সম্পর্ক জোরদার করার ওপর জোর দেয়া, কাজেই সেটা সফর শেষ হওয়ার পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতেও দেখা গেছে। সফরের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক সম্পর্ককে অভিহিত করা হয়েছে ‘অভিন্ন গন্তব্যে চীন-মিয়ানমার সম্প্রদায়’। চীনা পক্ষ থেকে সম্পর্কটিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় ছিল। আর রোহিঙ্গা সমস্যার মতো সবচেয়ে জটিল ইস্যুগুলোও এখানে কাজ করেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে সমর্থন দিয়েছে চীন এবং মিয়ানমার স্বীকার করে নিয়েছে যে তাইওয়ান হলো চীনের অংশ।

চীনা প্রেসিডেন্ট জিনপিংয়ের রাজনৈতিক চিন্তাধারার আলোকেই অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্প্রদায় পরিভাষাটি সফরের সময় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে। এখন তিনি তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনশিয়েটিভের (বিআরআই) ওপর জোর দিচ্ছেন। তার এই পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সড়ক ও রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা, যা সিল্ক রোড ইকোনমিক বেল্ট নামে পরিচিত এবং সি রুটটি একুশ শতকের শতকের সমুদ্র সিল্ক রোড নামে পরিচিত। এতে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের প্রায় ৭০টি দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগের বিষয়টি সম্পৃক্ত রয়েছে।

২০১৭ সালে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম বেল্ট অ্যান্ড রোড ফোরামে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি যোগ দিয়েছিলেন। এতে শি বিশ্বকে নতুন করে গড়ে তোলা নিয়ে বেইজিংয়ের উচ্চাভিলাষের বিষয়টি তুলে ধরেছিরেন। চীনাদের অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের ধারণাটি আসলে সাম্য ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে নতুন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। ফোরামে প্রেসিডেন্ট শির উদ্বোধনী বক্তব্যে স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে যে বিআরআইয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো মানবজাতিকে ভবিষ্যতে অভিন্ন সম্প্রদায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

শি জিনপিং এই অভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার জন্য ৫টি বিষয় তুলে ধরেছেন। এসবের মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পরিবেশ।

তিনি বলেন, আমাদের উচিত হবে এমন অংশীদারিত্ব বিনির্মাণ করা যেখানে দেশগুলো একে অপরের সাথে সাম্যপূর্ণ আচরণ করবে, পারস্পরিক পরামর্শে কাজ করবে, পরস্পর পরস্পরকে বুঝবে।

তিনি বলেন, আমাদের উচিত হবে নিরক্ষেপ, ন্যায়বিচার, যৌথ অবদানপূর্ণ ও সবার জন্য কল্যাণকর একটি নিরাপত্তা ভিত্তি রচনা করা। আমাদের সম্প্রীতি, অন্তর্ভুক্তি ও ভিন্নমতকে শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করতে হবে।

ফলে অভিন্ন স্বার্থসংবলিত সম্প্রদায়ের ধারণাটি অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক ইস্যুগুলোর সাথে সম্পৃক্ত। এশিয়ায় চীন নতুন যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, এটা তার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। চীন তার ক্রমবর্ধমান শক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বৈশ্বিক ব্যাপারে তার ভূমিকা বাড়াতে চায়।

ইয়ুন বলেন, তবে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিরোধের মুখে পড়ে, বিশেষ করে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায়, এই সফরের মাধ্যমে বেইজিং তার সফট পাওয়ার লক্ষ্যগুলো নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। এগুলো হলো মিয়ানমারের সাথে সম্পর্কের মাধ্যমে চীনের বদান্যতা প্রদর্শন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার হৃদয়-মন জয় করা।

তবে আঞ্চলিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এই সফরের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল। বিশেষ করে যে সময় সফরটি অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেটি আমলে নিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। আর তা হলো মিয়ানমারের নির্বাচন। দেশটির বেসামরিক নেতৃবৃন্দ পুনর্নির্বাচিত হওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। ২০২০ সালে এটিই ছিল শির প্রথম বিদেশ সফর, আর মিয়ানমার গেলেন ২০০৯ সালের পর। তিনি মনে করছেন, মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক জোরদার করার এটাই সবচেয়ে ভালো সময়। তার দ্বিতীয় টার্গেট ছিল চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর (সিএমইসি) এগিয়ে নেয়া।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড ইন্টিলিজেন্সের অধ্যাপক জন ব্লাক্সল্যান্ড মনে করেন, শির সফরটি সফল হয়েছে। কিয়াকফু এখন ভারত মহাসাগরে যাওয়ার চীনের প্রবেশদ্বার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তিনি বলেন, মালাক্কা প্রণালী এড়িয়ে যাওয়ার জন্য মিয়ানমারের সমর্থন লাভ নিশ্চিত করা চীনের জন্য ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শি তা পেয়ে গেছেন।

শির সফরকালে মিয়ানমার ও চীন মোট ৩৩টি সমঝোতা স্মারক, চুক্তি, পত্র বিনিময় ও প্রটোকলে সই করে। এসবের লক্স্য দ্বিপক্ষীয সম্পর্ক জোরদার করা। তিনি আগামী তিন বছরে মিয়ানমারকে উন্নয়ন সহায়তা বাবদ ৫৭০ মিলিয়ন ডলার প্রদান করা।

মিয়ানমারের পাশাপাশি কমিউনিস্ট লাউস ও আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন স্বৈরতান্ত্রিক কম্বোডিয়ার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে চীন সুস্পষ্টভাবে লাভবান হবে। এই তিনটি দেশের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করা মানে আসিয়ানের মধ্য থেকে চীনের সমর্থন লাভ করা। বিনিময়ে এই তিন দেশ আর্থিকভাবে লাভবান হবে।

অবশ্য কট্টর জাতীয়াতাবাদী মিয়ানমার চীনের ঘুঁটিতে পরিণত হবে, এমন সম্ভাবনা কম। খুব সম্ভবত সে এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা চালাবে।

মিয়ানমার বিআরআইকে পুরোপুরি সমর্থন করলেও মিয়ানমারের জনগণের জন্য কল্যাণকর না হলে সে কোনো প্রকল্পে রাজি হবে না। তাছাড়া পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হবে, এমন কোনো প্রকল্পও সে অনুমোদন করবে না। শির সফরকালে বিষয়টি তাকে সুস্পষ্টভাবে বলেও দিয়েছেন সু চি।

মিয়ানমারের উন্নয়নের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তাকে সেগুলো সতর্কভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সু চি বলেছেন, অপ্রয়োজনীয় ঋণের বোঝা সৃষ্টি করে বা দেশের ওপর দায় চেপে বসে, এমন কোনো প্রকল্প মিয়ানমার গ্রহণ করবে না।

মিয়ানমারের এই শর্ত গ্রহণ করে নিয়েছে চীন। এমনকি মিয়ানমারের সাথে করা কোনো চুক্তিই বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক নয় বলেও শির সফরের সময় ঘোষণা করা হয়েছে।

তবে মিয়ানমারকে বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা দিলেও চীনের কৌশলগত ভিশন রাজনৈতিকই থেকে গেছে। তারা তাদের দক্ষিণ দিকের প্রতিবেশীকে বন্ধুপ্রতীম, শান্তিপূর্ণ ও চীনপন্থী এলাকায় পরিণত করে ফেলেছে। মিয়ানমার শেষ দেশ হিসেবে চীনের সাথে এত ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত হলো। এর আগে লাওস ২০১৭ সালে ও কম্বোডিয়া ২০১৮ সালে চীনের সাথে এমনভাবে সম্পৃক্ত হয়েছিল।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে চীনের ওপর চড়াও হয়েছিল, তাতে করে মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করাটা চীনের জন্য বিশেষভাবে প্রয়োজনীয় ছিল।

অনেক বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকই প্রেসিডেন্ট শির সফরটিকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। এর ফলে এই অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব খর্ব হতে পারে বলে অধ্যাপক স্টেইনবার্গ মনে করছেন। এই দিকটি বিবেচনা করা হলে বলতেই হবে শির সফরটি ছিল খুবই সফল।


 

Share This