সভ্যতা, মানবতা ও আমাদের ব্যর্থতা

[ লিখেছেন: মোঃ জিয়াউদ্দিন ]


বর্তমান যুগে প্রকাশ্যে মানুষ বেচাকেনা হয় না। সময়ের পরিবর্তনের সাথে মানুষ বুঝতে পেড়েছে যে, মানুষ বেচাকেনা একটি ন্যাক্কারজনক প্রচলন। এই উপলব্ধির জাগরণকে কি আমরা মানবতা ও সভ্যতার অগ্রগতি বলতে পারি?

হয়তোবা হ্যাঁ…!

কিন্তু বর্তমানে আমরা যখন শিশুদের দিয়ে টাকার বিনিময়ে কঠোর পরিশ্রমের (কামলা) কাজগুলো করিয়ে নেই, তখন মনে আবার প্রশ্ন আসে: মানবতা ও সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি কি আদৌ হয়েছে? নাকি, অমানবিক আচরণ ও অসভ্যতার প্রকৃতিগত পরিবর্তন বা মডিফিকেশান হয়েছে মাত্র।

হয়তোবা মানব জাতির সময়ের পরিবর্তনের সাথে উপলব্ধির জাগরণ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই উপলব্ধিতে মনে হয় কোনো ত্রুটি আছে।

তাই তো আমরা এক প্রকারের অমানবতা ও অসভ্যতাকে আরেক প্রকারের অমানবতা ও অসভ্যতা দিয়ে প্রতিস্থাপন বা রিপ্লেস করেছি। কেননা আজকে মানুষের বেচাকেনাকে নেই, কিন্তু আছে শিশুদের দিয়ে মাঠে-ঘাটে, হোটেল-রেস্তোরায় ও কলকারখানায় কঠোর পরিশ্রম করিয়ে নেওয়ার প্রচলন।

ভালো-খারাপের উপলব্ধি জাগরণের বিষয়টি হয়তোবা এখনও গুণীজনদের কোনো আলোচনায় ‘নীতিকথার’ জায়গা পূরণ করতে কাজে লাগে, কিন্তু ভালো-খারাপের উপলব্ধি আজ পর্যন্ত প্রকৃত অর্থে জাগানো সম্ভব হয়নি।

রোহিঙ্গা ও সিরীয়রা যাদের হাতে নির্যাতিত হয়েছে, তারাও মানুষ

মায়ানমার-এর রাখাইন রাজ্যে সম্ভব হয়নি মানুষের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করা। রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা যাদের হাতে অমানবিকভাবে নির্যাতিত হয়েছে, তারাও মানুষ।

কিন্তু ভালো-খারাপের উপলব্ধি হয়তো নির্যাতনকারীদের মধ্যে জাগাতে অক্ষম হয়েছে সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বব্যবস্থা।

ব্যর্থ হয়েছে নিষ্পাপ সিরীয় শিশুদের ওপর একের পর এক রাসায়নিক বোমা নিক্ষেপ করা থেকে সিরিয়ার বাশার-আল-আসাদ ও তার বাহিনীকে বিরত রাখতে; যে বোমাগুলোর বিষক্রিয়ায় এই নিষ্পাপ শিশুগুলোকে ধুকে ধুকে, অনেক কষ্ট পেয়ে মরতে হয়েছে।

আমেরিকায় কিশোরদের বন্দুক-সহিংসতার

শুধু রাখাইন রাজ্যে বা সিরিয়ায় নয়, পুরো পৃথিবীতেই কোথাও মানুষ এখনো পুরোপুরি সভ্য হতে পারেনি। তাই আমেরিকার মতো দেশেও বন্দুক-সহিংসতার মতো ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে। একটু ভাবুন তো, মানবিকতার কতটুকু অভাব থাকলে একজন কিশোর তার সহপাঠী ও শিক্ষকদের উপর বন্দুক তাক করে হামলা করতে পারে।

হয়তোবা ঐ কিশোরগুলো তাদের চারপাশ – অর্থাৎ স্কুল ও পরিবার – থেকে মানবিকতার শিক্ষা পায় নি। অর্থাৎ তারা প্রকৃত অর্থে সভ্য মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠে নি। তাই তো যাদের সাথে তারা প্রতিদিন স্কুলে সময় কাটায় সেই বন্ধু, সহপাঠী ও শিক্ষকদেরই এই বন্দুকধারী কিশোররা হামলার শিকারে পরিণত করে।

মালিক-কর্মচারী, চাকর-মুনিব নয়…!

তাছাড়া, আমাদের সমাজে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিক ঐ প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের সাথে যেভাবে আচরণ করে, তাতে মনে হয় যে, সে ঐ কর্মচারীদেরও মালিক।

ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে দেখা যায় যে, প্রতিষ্ঠানের মালিকের সন্তানের স্কুলের বেতন থেকে শুরু করে মালিকের বাড়ির পুনঃসজ্জার বা রি-ডেকোরেশন কাজের তত্ত্বাবধায়নও কর্মচারীদের করতে হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানের মালিকরা ভুলে যান যে, তাদের এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের মাঝে কোনো চাকর-মুনিবের সম্পর্ক নেই; যে সম্পর্কে আছে, সেটা বর্তমান যুগের চুক্তি ভিত্তিক সম্পর্ক, যাকে আমরা ইংরেজিতে এমপ্লয়ার-এমপ্লয়ী কন্ত্রাকচুওয়াল রিলেশনশিপ বলে থাকি।

সার্টিফিকেট-সর্বস্ব শিক্ষা

এমন মালিকরা বেশিরভাগই উচ্চ ডিগ্রীধারী হলেও তাদের শিক্ষিত বা সভ্য বলা ঠিক হবে না।

ঠিক শুনেছেন…! এদের শিক্ষা হলো সনদ-সর্বস্ব বা সার্টিফিকেট-সর্বস্ব।

অর্থাৎ এরা শুধুমাত্র সনদ বা সার্টিফিকেটের জন্যে পড়াশোনা করে, শিক্ষিত হওয়ার জন্যে নয়। তাই তারা প্রকৃতপক্ষে শিক্ষিত নয়। মানবতা বা সভ্যতা কি সেটা তারা অনুধাবন করতে পারে না।

একটি সভ্য সমাজ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও তারা উপলব্ধি করতে পারে না। অতএব, তারা এও উপলব্ধি করতে পারে না যে, সেই সভ্য সমাজে মানবতার ভূমিকা কি হতে পারে।

অতীতের থেকে আরও অসভ্য…!

সভ্যতা ও মানবতার উপলব্ধির অভাবে আজও আমাদের মধ্যে ঐসব অপরাধগুলো করার প্রবণতা রয়ে গেছে যেসব অপরাধগুলো আদিকালে মানুষরা করতো। খুন, ধর্ষণ ইত্যাদি হাজার হাজার বছর আগেও ছিল, এখনও আছে। বরঞ্চ এখন সংখ্যায় অনেক বেড়ে গেছে।

এছাড়াও যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন অপরাধ। আগে জানতাম চুরি, এখন শুনি কর্পোরেট চুরি (কর্পোরেট থেফট)। আগে জানতাম খুন, এখন শুনি কর্পোরেট বেআইনি নরহত্যা (কর্পোরেট ম্যান্সলটার)।

তাই বুঝতে বেগ পেতে হয়: আমরা কি অতীতের থেকে সভ্য হতে ব্যর্থ হয়েছি, নাকি আরও অসভ্য হয়ে গেছি।

সভ্যতার ও মানবিকতার উপলব্ধি জাগরণ করা সম্ভব

মোটাদাগে বলতে গেলে আমরা সভ্য হতে ব্যর্থ হয়েছি। তবে, হতাশা হবার কিছু নেই।

সভ্য হওয়ার ও সমাজে মানবিকতার চর্চা প্রতিষ্ঠা করার জন্যে যুগ যুগ ধরে মানুষের যে প্রচেষ্টা, সেটা মোটেও বন্ধ করা যাবে না। তবে কোন পন্থায় এবং কি কি উপায়ে সমাজের মধ্যে সভ্যতার ও মানবিকতার উপলব্ধি জাগরণ করা সম্ভব, তা পুনরায় ভেবে দেখতে হবে।

আর আমাদের একটি সভ্য ও মানবিক সমাজ গড়তে হলে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে শিশু ও কিশোরদের প্রতি।

সাধারণত প্রত্যেক মানুষ সমাজ ও পৃথিবী সম্পর্কে তার প্রাথমিক শিক্ষা পায় পরিবারের কাছ থেকে। তাই অভিভাবকদের খুব সচেতনতার সাথে তাদের সন্তানদের এমনভাবে বড় করতে হবে যেন সন্তানরা জীবনের প্রতিটি ধাপেই, প্রতিটি পদক্ষেপেই, প্রতিটি পরিস্থিতিতেই সভ্যতা ও মানবিকতাকে সবচাইতে বেশি গুরুত্বের সহকারে দেখে।

তাছাড়া, সন্তানরা কোথায় যায়, কিভাবে আচরণ করে, ইত্যাদি সবসময় খেয়াল রাখতে হবে।

সঙ্গ বেশ বড় একটি বিষয়। অনেক ভালো সন্তানরাও ভুল বা অসৎ সঙ্গের প্রভাবে নষ্ট হয়ে যায়। তাই কার সাথে মিশে তা লক্ষ্য রাখতে হবে।

তাদের মধ্যে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মতো কোনো লক্ষণ দেখা যায় কিনা তাও লক্ষ্য রাখতে হবে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি না সভ্যতা বুঝে, না বুঝে মানবিকতা।

সর্বোপরি, অভিভাবকদের নিজেদের মধ্যেই সভ্যতা ও মানবিকতা থাকতে হবে। অভিভাবকদের মধ্যে সভ্যতা ও মানবিকতা না থাকলে পরবর্তী প্রজন্ম থেকেও আশা করা যাবে না।


Hits: 336

মোঃ জিয়াউদ্দিন

মোঃ জিয়াউদ্দিন ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন থেকে এলএল.বি ডিগ্রি অর্জন করার পর ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে এলএল.এম ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পরবর্তীতে তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক-এর উপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি পিজিডি করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.