আমাদের শহর নিজস্ব ছন্দ হারিয়ে ফেলছে

[ লিখেছেন: মেজবাহুল হাদি ]


বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, আর এই শহরের ঐতিহ্যবাহী একটি এলাকা “পুরান ঢাকা”। ১৬০৮ ইং সনে “জাহাঙ্গীর নগর” নামে এই এলাকাটি মুঘল বাংলার রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সমৃদ্ধ শহরগুলোর অন্যতম এবং বিশ্বব্যাপী মসলিন বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল।

পুরাতন এই শহর আজ বিস্তৃত হয়ে একটি বড় শহরে রূপান্তরিত হয়েছে। কালের বিবর্তনে আজকের ঢাকা একটি আধুনিক শহরে পরিণত হয়েছে।

আর এই কাল ও সময়ের বিবর্তনে এবং আধুনিকতার চাপে চারপাশের পরিবেশও পাল্টে গেছে। এই পরিবর্তিত পরিবেশের যেমন অনেক সুফল রয়েছে, তেমনি রয়েছে অনেক কুফলও। আমাদের শহরের ময়লা-আবর্জনার বাড়ন্ত আধিপত্য এই কুফলগুলোর অন্যতম।

কালের বিবর্তনে এবং সঠিক পর্যবেক্ষণ ও পরিকল্পনার অভাবে ঢাকা পরিণত হয়েছে একটি জনবহুল নগরিতে। ২০০৫ সালে থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এই নগরের জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।

জায়গার তুলনায় মানুষের মাত্রাতিরিক্ত আধিক্য অনেক সমস্যা সৃষ্টি করেছে। এই সমস্যাগুলোর মধ্যে প্রধানতম দুটি সমস্যা হলো ব্যবহার্য পানির সংকট ও ময়লা-আবর্জনার আধিপত্য।

আমরা যারা ঢাকায় বসবাস করি, তারা যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে এই সব ময়লা সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে অপসারণ বা স্থানান্তর করা যথাযথ কর্তৃপক্ষের জন্যে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পরে। এই কারণে প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে ও হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। পরিবেশ তার নিজস্ব ছন্দ হারিয়ে ফেলছে, নিজস্ব নিয়মের বাইরে আচরণ করছে।

ধানমন্ডি লেকের সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশেকে নষ্ট করছে ময়লা-আবর্জনা

শহরের প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘেরা অন্যতম একটি স্থান হলো ধানমন্ডি লেক ও লেকের পার ঘেঁষা ছোট হাঁটার রাস্তা ও গাছগাছালা। এই লেক ও এর আশপাশের জায়গা ভালো একটি অবকাঠামোর প্রতিচ্ছবি।

ধানমন্ডি লেকে মানুষ সকালে হাটতে ও ব্যায়াম করতে আসে। সুস্থ থাকার প্রয়াসে নগরবাসী খোলা আকাশের নিচে প্রাকৃতিক পরিবেশে একটু সময় কাটাতে পছন্দ করে এই লেক-এলাকায়।

কিন্তু প্রতিনিয়ত এই লেক-এলাকায় নগরবাসী চলাচলের সময় ময়লা ফেলে এতো পরিকল্পিত একটা স্থানের মাধুর্য ও সৌন্দর্যকে ম্লান দেয়। এই লেক এলাকায় প্রতিনিয়ত দেখা যায় ময়লা-আবর্জনার ভয়াবহ অবস্থা।

এই এলাকায় খোলা আকাশের নিচে প্রাকৃতিক পরিবেশে একটু হাটতে ও ব্যায়াম করতে এসে উল্টো ময়লা থেকে ছড়ানো দুর্গন্ধে ও রোগজীবাণুতে ভুগতে হচ্ছে এই লেক এলাকায় আসা নগরবাসীদের। শরীর ও মন ভালো রাখতে গিয়ে উল্টো অজান্তেই অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

দুপুর, বিকেল এবং সন্ধ্যায়ও হাজারো মানুষ এই ধানমন্ডি লেক-এলাকায় বিনোদনসহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে আসে। সকালে আসা নগরবাসীদের মতো এরাও ময়লা থেকে উদ্ভূত দুর্গন্ধে ও রোগজীবাণুতে ভুগছে।

ময়লা-আবর্জনার আধিপত্যের কারণে জমিয়ে আড্ডা কঠিন হয়ে পরছে

আমি প্রায়ই এক প্রাক্তন সহকর্মীর সাথে দেখা করে চা পান করতে করতে জমিয়ে আড্ডা দেই।

মাঝে মাঝে টং-এর পাশে চা পান করি আর আড্ডা জমিয়ে দেই, আর মাঝে মাঝে পাশের হোটেল থেকে চা নিয়ে এসে রাস্তায় আড্ডা জমে।

কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়েও আলোচনা জমে উঠে। তাই ঐ স্থানটিতে ঐ ব্যক্তিটির সাথে আড্ডা-আলোচনা আমার জন্যে খুবই স্পেশাল।

তবে দুঃখজনক বিষয়টি হলো, ঐ স্থানটি ক্রমশ আড্ডা-আলোচনার জন্যে অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। ঐ স্থানটির পার্শবর্তী রাস্তাটিতে অস্বাভাবিকভাবে আবর্জনার আধিক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তাছাড়া রাস্তা থেকে ভেসে আসছে প্রস্রাবের অসহনীয় দুর্গন্ধ। সচরাচর ঐ রাস্তাটিতে অনায়াসে ও কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে ময়লা ফেলতে ও পস্রাব করতে দেখা যাচ্ছে মানুষজনদের।

অথচ, এই স্থানটির পাশে রয়েছে বেশ কিছু চায়ের দোকান। তাছাড়া আশেপাশে আমরা বেশ কিছু ভালো খাবার হোটেল ও রেস্তোরা দেখতে পাই।

এই ধরণের চায়ের দোকান, হোটেল, রেস্তোরা ও আলোচনার স্থানে যদি এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থাকে, তাহলে আমরা নগরবাসীরা দিনে দিনে এইসব খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পরবো এবং পাশাপাশি আমাদের বিচরণের জায়গাগুলোও ক্রমশ সংকোচিত হয়ে পরবে।


Hits: 2073

মেজবাহুল হাদি

মেজবাহুল হাদি সমাজের সমস্যাগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন। তারই ফলশ্রুতিতে তিনি কয়েকটি পোস্ট লিখেছেন। তিনি আইন পেশার সাথে জড়িত আছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.